The Hateful Eight – বিশ্বাসের স্থান নেই যেখানে

the hateful eight
কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনো ! এই একটি নামই লক্ষ ভক্তের মুখে হাসি এনে দিতে পারে আবার একই সাথে লক্ষ নিন্দুকের মুখে আনে বিরক্তি।
ট্যারান্টিনোর মুভির নির্মানের স্টাইল নিয়ে অনেকেরই নানা আপত্তি আছে। তার মুভিতে নাকি বকরবকর অতিরিক্ত হয়, ক্যারেক্টারগুলো কাজের চেয়ে ডায়ালগ ছাড়ে বেশি।
আবার যখন কাজ করে তখন আবার অতিরিক্ত ভায়োলেন্ট হয়ে যায়। ভায়োলেন্সের মাত্রাতিরিক্ততায় তখন নাকি আবার পর্দায় চোখ রাখা যায় না।
একজনের সাথে একবার তর্ক হচ্ছিল পাল্প ফিকশন কেন এত রেটিং পায় সে বিষয়ে। তার মতে, পাল্প ফিকশনে তেমন কোনো স্টোরিই নেই।
চরিত্রগুলো যে যার মত ডায়লগ বলে যাচ্ছে, কাহিনী কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে তার কোনো আগামাথা নেই। দুমিনিট কথা বলেই বুঝতে পারলাম সে আসলে মুভির একবর্ণও বোঝে নাই।
বেচারার দোষ তেমন নাই আসলে, ট্যারান্টিনোর মুভি-মেকিং স্টাইলটাই এমন ব্যাতিক্রমধর্মী যে, চট করে অনেকের মাথায়ই তার মুভির বিষয়গুলো আসে না।

Movie : The Hateful Eight
Genre : Crime, Comedy, Drama

>The Hateful Eight (2015) on IMDb

Download Link

হেইটফুল এইটকে নিয়ে বলতে গেলে আসলে নানা বিষয়ই আলোচনায় চলে আসে।
সাধারণ একটা থ্রিলারের মধ্যেই ট্যারান্টিনো নানা খেলনা নিয়ে খেলেছেন। ইতিহাসের পাতার বিভিন্ন  স্পর্শকাতর অংশগুলো নিয়ে মেতেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ, তৎকালীন সময়ের বর্ণ বিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ নিয়ে বিপজ্জনক খেলার পর “আগাথা ক্রিস্টির” ঝাঝালো গোয়েন্দা গল্পের মত গল্পকে কড়া করে একটা টুইস্ট দিয়েছেন। জমজমাট কোনো থ্রিলার বইয়ের মতই সারাক্ষণ বুকের ভেতর একটা চাপা কাপুনি ধরিয়ে রেখে শেষে গিয়ে সেই চিরায়ত ভায়লেন্সের আগমন।
লাল রঙের বিশেষ তরল পদার্থকে পরিচালনার তুলি দিয়ে একেছেন মুভি-ক্যানভাসের প্রতিটা অংশে। এই লাল তরলকে এমন শৈল্পিকরুপ দিয়ে তুলে ধরা শুধু ট্যারান্টিনোর পক্ষেই সম্ভব। আর এতসব জিনিসকে রুক্ষতার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছেন তিনি তার ওয়েস্টার্ণ স্টাইল দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে তখন সবেমাত্র গৃহযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলেও বিদ্বেষ মোটেও কমেনি। ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের বরফাস্তীর্ণ দুর্গম অঞ্চলের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে এক তুষারঝড়। এমন নির্জন তুষারশুভ্র প্রান্তরে কাঠের এক যিশুমুর্তি যেন তার অন্তিমক্ষণেরই অপেক্ষায় আছেন।
এরই মধ্যে দিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে যাচ্ছে দুইজন যাত্রী, গন্তব্য রেডলক। এর মধ্যে একজন হলেন বাউন্টি হান্টার জন রুথ, আরেকজন তার বন্দী পলাতক খুনী ডেইজী ডমারগিউ। রুথ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ফাসির দড়িতে ঝোলানোর জন্য, বিনিময়ে সে পাবে পুরস্কার।  গাড়োয়ান তার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন তুষারঝড়কে পেছনে ফেলে গন্তব্যে পৌছাবার।
কিন্তু পথ আটকিয়ে দাড়ায় আরেক বাউন্টি হান্টার মার্ক ওয়ারেন, তারও গন্তব্যস্থল রেডলক, সঙ্গে যেতে চায় সে। কিন্তু জন রুথ অসম্মতি জানালে সে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন থেকে প্রাপ্ত এক চিঠি। যে লোক প্রেসিডেন্টের এমন পরিচিত তাকে কি আর ফেলে রাখা চলে?   রাজী হয়ে যায় জন। এদিকে আরেকজনও যাত্রায় সঙ্গী হয়, ক্রিস ম্যানিক্স। নিজেকে সে রেডলকের শেরিফ দাবী করে।
তুষারঝড় থেকে বাচতে তারা একসময় মিনির সরাইখানাতে উপস্থিত হয়, কিন্তু মিনি কই? তার বদলে সেখানে আছেন চারজন ব্যক্তি, তাদের একজন দাবী করে যে মিনি অন্যখানে বেড়াতে গেছে, সেই এখন সরাইখানার দেখভাল করছে।
কিন্তু কাউকেই তো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না, এদিকে বাইরের যা অবস্থা তাতে তাদেরকে এখানেই রাত কাটাতে হবে। রাতটা কেমন কাটে তাদের?

মুভিটা ৭০ মিলিমিটার ফ্রেমে ধারণ করেছেন ট্যারান্টিনো। তবে এত ওয়াইড এঙ্গেল ক্যামেরা  বাইরের দৃশ্য দেখানোর জন্যে ব্যবহৃত হয় নি, মুভির অধিকাংশ অংশই হয়েছে একই রুমের ভেতর। আর এখানেই ক্যামেরার কারসাজি। একই শটে পুরো কক্ষটির ছবি ভেসে উঠেছে। ঘরের কে কোথাই কি করছে সবই দেখা যাচ্ছিল।
কেউই যেখানে বিশ্বস্ত নয় সেখানে সবার উপর নজর রাখাই শ্রেয়।

ওয়েস্টার্ণ ট্যারান্টিনোর প্রিয় জনরা হলেও এই জনরার মুভি বানিয়েছেন বেশ পরে, জ্যাঙ্গো আনচেইন্ডে অসাধারন সাফল্যের পর আবার এই জনরার মুভি হেইটফুল এইট। তবে এবার ঠিক আগের স্বাদে আবদ্ধ থাকেন নি তিনি, দিয়েছেন আলাদা থ্রিলারের মাত্রা।
সেই আগের মতই সংলাপের ভাজে ভাজে গুজে দিয়েছেন চরম ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ, কমেডির মধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন ইতিহাসের নির্লজ্জ কিছু দিকের। আরেকটা জিনিস ইন্টারেস্টিং লেগেছে সেটা হল, মুভির মাঝে ইন্টারমিশনের অন্তর্ভুক্তি।
শেষ কবে হলিউড মুভিতে ইন্টারমিশন দেখেছিলাম তা মনে পড়ে না, তবে এই মুভিতে ইন্টারমিশন একদম জায়গামত বসানো হয়েছে।

স্যামুয়েল এক জ্যাকসন, ট্যারান্টিনোর প্রিয় অভিনেতা, ফিরে এসেছেন আবার তার মুভিতে। লোকটা তার চকচকে উজ্জ্বল চোখ নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বিদ্রুপাত্মক সব ডায়ালগ যেভাবে দেয় তাতে তার চরিত্রে অন্য কাউকে কল্পনা করা অসম্ভব।
মার্ভেলের মুভিতে তাকে দেখে কেমন বিতৃষ্ণা ধরে গেছিল, এই মুভির মাধ্যমে তিনি আবার সেই ডোমিনেটিং রোলে ফিরলেন, আর বাজিমাত যে করেছেন তা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না।
অন্যান্য অভিনেতারাও যার যার কাজ ঠিকমতই করেছেন। কুর্ট রাসেলের ভরাট সংলাপ মনে ধরেছে, আর ওয়াল্টন গগিংসের অমন বাকা সুরে কথা বলার স্টাইলটা বড্ড ভাল লেগেছে।
তবে এতজনকে ছাপিয়ে গেছেন একমাত্র নারী চরিত্র জেনিফার জেসন। দুর্ধর্ষ খুনির চরিত্রে তিনি মুলত এক্সপ্রেশন দিয়েই মন জয় করেছেন, সাথে ক্ষুরধার ডায়লগ তো ছিলই। মুভিতে তার উপর দিয়ে নির্যাতনের বেশ ঝড় বয়েছে বলা যায়। এই মহিলা সাপোর্টিং রোলে এবার অস্কার না জিতলে কষ্টই পাব।

মুভির সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন “Good, Bad and Ugly” খ্যাত কম্পোজার এনিও মরিকনে, আর কিছু বলার অপেক্ষা রাখে কি? বরাবরের মতই তিনি তার মাথানষ্ট করা অরিজিনাল স্কোর দিয়ে মাতিয়েছেন। The Thing এর অব্যবহৃত স্কোরটা ব্যবহার না করলে হয়ত অস্কারে মনোনয়ন পেয়ে যেতেন তিনি।

মুভির শেষে গিয়ে একটু যেন অতিরঞ্জন মনে হয়েছে, আরেকটু পালিশ করলেই পারফেক্ট এন্ডিং হতে পারতো।

তারান্তিনো হেটারদের জন্য এটা বেশ সুবিধাজনক মুভি, সমালোচনা করার জন্য প্রচুর উপাদান রয়েছে এই মুভিতে। রয়েছে ইতিহাসের কিছু কলঙ্কিত অধ্যায়ের রেফারেন্স, আছে বর্ণ বিদ্বেষের উপস্থিতি, জাতিবিদ্বেষ নিয়ে ছড়ানো ঘৃণা। আর জেনিফারের চরিত্রে তো তারা শুধুই নারী বিদ্বেষ খুজে পাবে।
আর, শেষে যা আছে তা তো বরাবরই তাদের অপ্রিয়।

তবে আমি নিজেও স্বীকার করব যে, এটা মোটেও ট্যারান্টিনোর সেরা মুভির মধ্যে পড়ে না। কিছু দিকে পরিচালক একটু অতিরঞ্জন করে ফেলেছেন, স্টোরির গভীরতাও হয়ত তেমন নেই, অনেকে হয়ত শেষাংক নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন।
তবুও আটজন অবিশ্বাসী লোক একই ছাদের নিচে কিভাবে রাত কাটায় আর তাদের মধ্যকার কথাবার্তা কোন লেভেলের কমেডি হতে পারে এটার স্বাদ আমি আবার নিতে চাইব।

পরিশেষে বলতে চাই, তিনঘন্টার সুদীর্ঘ এই মুভিটি শুধুমাত্র ট্যারান্টিনো ভক্তদের জন্য দ্রষ্টব্য। অন্যারা দেখতে গেলে হতাশ এবং বিরক্তই হবেন বলা চলে। তবুও যদি ধীরগতির সংলাপে ডার্ক কমেডির মজা আর সাথে কড়া থ্রিলারের মজা নিতে চান তাহলে ট্রাই করে দেখতে পারেন।

আমার রেটিং :

Leave a Reply