The Revenant মরণে অকুতোভয় সৈনিক

revenaant

শারীরিক দিক দিয়ে বিধাতা মানুষকে তুলনামূলক দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। আত্মরক্ষার জন্য মানুষের নেই কোনো তীক্ষ্ণ নখ, নেই ধারালো দাঁত বা বিষাক্ত ছোবল। বন্য নানা পশুর সামনে মানুষ স্পষ্টতই অসহায়।
কিন্তু এত কমতির মাঝেও মানুষের আছে বেঁচে থাকার সুতীব্র ইচ্ছা। সব হারিয়েও সে খড়কুটোকে সম্বল করেই বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারে।
আর, মানুষের এই প্রবল জীবনতৃষ্ণাই সব ধরনের প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে তার বেচে থাকার মূল অস্ত্র। আপাত দৃষ্টিতে যা অসম্ভব লাগে, বিপদের মুখে বাচার নেশায় সেই কাজটিই মানুষ করে ফেলতে উন্মুখ হয় অনায়াসে।
চারপাশের সামান্য যা কিছু পায় তা কাজে লাগিয়েই সে সামাল দেয় যে কোনো বাধাবিপত্তি, বুকের ভেতর ধিকিধিকি করে জ্বলে থাকা জ্বীবনপ্রদীপই আলো দেখায় যে কোনো অন্ধকারে, উষ্ণ রাখে শীতল দেহকে।
আর এর সাথে যদি যোগ হয়ে প্রতিশোধের নেশা তাহলে সেই প্রদীপ রুপান্তরিত হয় জ্বলন্ত আগ্নেয়গীরিতে। উত্তপ্ত লাভার আগুনে পুড়ে পুড়ে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠে লৌহমানব, চোখে ফুটে ওঠে রক্তের নাচন।
এমন পরিস্থি্তিতে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ক্ষত বা প্রতিকূল পরিবেশ কোনোকিছুই তার লক্ষ্য থেকে তাকে টলাতে পারে না।
জীবনতৃষ্ণা আর প্রতিশোধ-নেশা মিলেমিশে এক হলে একজন মানুষের মনবল কেমন হতে পারে তারই উপাখ্যান হল The Revenant

Movie : The Revenant (2015)
Genre : Drama, Adventure

>The Revenant (2015) on IMDb

Download Link

মুভির মুলগল্প মিশেল পুনক এর একই নামে প্রকাশিত উপন্যাস থেকে নেয়া হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দিতে একদল আমেরিকান হান্টার আর ট্র্যাপার ডাকোটা অঞ্চলে এসে রেড ইন্ডিয়ান উপজাতিদের সাথে সংঘর্ষে পড়ে যায়। তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে আছে ফ্রন্টিয়ারম্যান হিউ গ্লাস।
দলের অনেকেই গ্লাসের সাথে নানা বিষয়ে একমত হতে না পারলেও এই বরফাস্তীর্ণ দুর্গম এলাকার পথ একমাত্র গ্লাসই ভাল জানে বলে তার কথা সবাই মেনে নিতে বাধ্য। কিন্তু হঠাত করেই একদিন এক ভয়ালদর্শন ভালুকের কবলে পড়ে সে।
বিরবিক্রমে লড়াই করে ভালুককে পরাজিত করতে পারলেও ভয়ানকভাবে আহত হন গ্লাস। এই দুর্গম অঞ্চলে তাকে বহন করে পথ চলতে ব্যার্থ হয়ে তাকে ফেলেই চলে যায় তার দল। শুধু সাথে থাকে তার ছেলে আর দলের দুইজন সদস্য। কিন্তু তারাও গ্লাসের সাথে প্রতারণা করে তার ছেলেকে মেরে তাকে ফেলেই চলে যায়।
শুরু হয় গ্লাসের বেচে থাকার অবর্ননীয় প্রচেষ্টা, সাথে যোগ হয় ছেলের হত্যার প্রতিশোধ নেশা। সে কি পারবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে?

মুভিটির পরিচালক গতবারের অস্কারজয়ী ইনারিতু কারিগরী দিক দিয়ে কোনভাবেই কমতি রাখেন নি। তার লং লং শট আর সিঙ্গেল প্যানিং ক্যামেরার কাজ দেখে চোখে বড় শান্তি লেগেছে। শুভ্র তুষারে চাপা প্রকৃতি আর তার মাঝে বনাঞ্চল প্রেক্ষাপট নিখুঁতভাবে ক্যামেরায় তুলেছেন।
আর ভালুকের সাথে ডি ক্যাপ্রিওর লড়াইয়ের দৃশ্যটা তো এবছরের অন্যতম দৃশ্য, মনমাতানো গ্রাফিক্সের কারনে শটগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মুভি দেখেন আর নাই দেখেন, এই দৃশ্য দেখতে ভুলবেন না কিন্তু

মুভির মূল দুটি চরিত্রে আছেন লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও এবং টম হার্ডি, সুতরাং অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নাই। টম হার্ডি তার নেগেটিভ রোলে যথেষ্ট সিরিয়াস ছিলেন, আপাতত তার জায়গায় অন্য কোনো মুখই কল্পনায় আনতে পারছি না।
ক্যাপ্রির জায়গায় প্রথমে ক্রিশ্চিয়ান বেলকে নেয়ার কথা ছিল, দুজনই আমার পছন্দের অভিনেতা।
ক্যাপ্রিও তার অভিনয় প্রতিভাকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন এই মুভিতে। মুমুর্ষূ রোগীর চরিত্রই বলুন আর সন্তানহারা প্রতিশোধোন্মুখ পিতার চরিত্রই বলুন সবই নিখুতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। কাঁচা মাছ চিবিয়েছেন, পশুর কাচা মাংশ খেয়েছেন, জমাট বরফে ডুবেছেন, শুয়েছেন মৃত ঘোড়ার পাঁজরে।
তার অভিনয় প্রতিভা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ না থাকলেও অনেকেই টিপ্পনি কাটে তার অস্কার-খরা নিয়ে। এবার বোধহয় নিন্দুকের মুখে ছাই পড়তে চলেছে।  একদিকে এমন অতুলনীয় অভিনয় আবার অন্যদিকে তেমন শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা, এযেনো সোনায় সোহাগা।
তবে দ্যা ডেনিশ গার্ল এডি রেডমেইনে জোর প্রতিপক্ষ হিসেবে লড়াইয়ে আছেন।
এতদসত্ত্বেও, আমার কাছে এটা ক্যাপ্রিওর সেরা অভিনয় লাগে নি। ক্যাপ্রিও মুভির জন্যে অনেক পরিশ্রম করেছেন বটে তবে পূর্বে সে এর থেকেও ভাল অভিনয় করেছে। যাই হোক, দেরীতে হলেও তার হাতে অস্কার উঠুক, আশা করি।

মুভিতে সারভাইভাল এডভেঞ্চারের সাথে সাথে আরো কিছু অনুগল্প ফুটে উঠেছে মুভিতে। আছে পিতা-পুত্রের ভালবাসার গল্প, স্বামী স্ত্রীর প্রেম কাহিনী। পিতা আহত হলে তাকে সারিয়ে তোলার জন্য পুত্রের সর্বাত্মক চেষ্টা, স্বামীর শয়নে স্বপনে মৃতা স্ত্রীর সাক্ষাত সবই যেন পরোক্ষভাবে ভালবাসার নিদর্শন।

মুভিতে তেমন কোনো ডায়ালগ নেই। কাহিনী দাড় করানো হয়েছে বেশ কিছু সাবপ্লটে, ওয়েস্টার্ন আকারে রিভেঞ্জ প্লটের সাথে সারভাইভাল প্লটের মিশেল দেয়া হয়েছে। নেই তেমন একশন দৃশ্য। অভিনয় যা হওয়ার সবই হয়েছে এক্সপ্রেশন দিয়ে।
তবে, মুভির মূল আকর্ষণ এর কারিগরী দিক, মনোমুগ্ধকর সব লোকেশন, ক্যামেরার ধূর্ত কারসাজি সবই আপনাকে আটকে রাখবে মুভির দিকে।

দেখা যাক ইনারিতু অস্কার জুরিদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারেন।

আমার রেটিং :

Leave a Reply