পথের পাঁচালী – জীবনযুদ্ধের যাত্রাপালা

pather-panchali

Movie : পথের পাঁচালী (১৯৫৫)

Genre : Drama


>Sicario (2015) on IMDb

পরিচালনা : সত্যজিত রায়

অভিনয় : করুনা ব্যানার্জী, উমা দাশগুপ্ত, সুবীর ব্যানার্জী

Download Link 


Not to have seen the cinema of Ray means existing in the world without seeing the sun or the moon – Akira Kurosawa

আসলেই তাই, সত্যজিত রায় তার অমর শিল্পপ্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে এমন সব সিনেমা আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন যা না দেখা অনেকটা চাঁদ-সূর্য না দেখে থাকার মতই বিশ্বয়কর, অন্তুত বাঙালীর জন্যে তো অবশ্যই।

সত্যজিত রায়ের সাথে পরিচয় সেই কিশোর কালে “ফেলুদা”র মাধ্যমে। সেই কিশোরমনে ফেলুদার পাশাপাশি তার রচয়িতাও স্থান পেয়েছিল বিশেষভাবে, যা ক্রমেই পাকাপোক্ত হয় প্রফেসর শঙ্কু, তারিনীখুড়োদের মাধ্যমে।

এর পরেই একদিন পেয়ে যাই সত্যজিতের সিনেমা, “পথের পাচালী”। প্রিয় লেখক বিভুতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের প্রিয় উপন্যাস “পথের পাচালী” অবলম্বনে সিনেমা করেছেন প্রিয় পরিচালক, সোনায় সোহাগা বুঝি একেই বলে

প্রথম সিনেমাতেই বাজিমাত করেছেন সত্যজিত, মুগ্ধতার রেশ কাটতে না কাটতেই দেখে ফেলি তার পরিচালিত সব মুভি (প্রায়) । বুঝতে পারি কুরসাওয়া মোটেও বাড়িয়ে বলেন নি কথাটা।

মুভির প্রেক্ষাপট সাজানো হয়েছে বিশ শতকের বিশের দশকের আদলে। নিশ্চিন্দিপুর নামক এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামে বাস করেন হরিহর রায় নামের এক পুরোহিত। স্ত্রী সর্বজয়া, মেয়ে দুর্গা আর ছোট ছেলে অপুকে নিয়েই তার ছোট্ট সংসার। আর আছেন দূর সম্পর্কের এক পিসি ইন্দিরা ঠাকুরন, যাকে এই গরিব সংসারে বোঝা মনে করেন সর্বজয়া।

স্বভাবে সহজসরল হওয়ার কারনে নানা মানুষ নানা ভাবে হরিহরকে ঠকায়, ফলে সংসারের খরচ বহন করার জন্যে তাকে দুরদুরান্তে কাজের আশায় ঘুরে বেড়াতে হয়। সর্বজয়াকে একার হাতেই চালাতে হয় সংসার।

সন্তানদের মধ্যে বড়বোন দূর্গা একটু চঞ্চল, প্রকৃতির বুকে দৌড়ঝাপ করে নানা গাছের ফুল ফল আস্বাদন করেই তার দিন কেটে যায়, অন্যদিকে অপু অনেকটা চাপা স্বভাবের, শৈশবকালীন দৌরাত্ম থাকলেও সে দুর্গার তুলনায় শান্ত ।

এই পাচটি চরিত্র নিয়েই সিনেমার গল্প এগিয়েছে। কখনো ভাল কাজ পাবার জন্য হরিহরের আশায় বুক বাধা, প্রতিবেশীর গঞ্জনা সহ্য করে সর্বজয়ার জীবন যুদ্ধ, দূর্গার ছোট্ট ছোট্ট দুষ্টুমি, ইন্দিরা পিসির প্রতি দূর্গার প্রবল আনুগত্য, সর্বজয়া-ইন্দিরা পিসির মধ্যকার সম্পর্কের লুকোচুরি খেলা ; এসব নিয়েই এগিয়ে চলেছে জীবন নামের বন্ধুর পথের মহাযাত্রা।

সিনেমার মূল চরিত্র মূলত দূর্গা, সে শুধু চঞ্চল দুরন্ত কিশোরীই নয়, তার মধ্যেও আছে গভীর মমতা বোধ, অপুকে বরাবরই সে মায়ের মতই আগলে রাখে। চুরি করা ফল দিয়ে আচার বানিয়ে খাওয়ানো, বৃষ্টির মধ্যে বুকে টেনে নেয়া, এসব যেন সেই মাতৃত্ববোধেরই রুপক প্রকাশ।  একারনে অপুও প্রচন্ড ভালবাসে তার দিদিকে,সারা দিন দিদির সাথেই সময় কাটে তার।

মুভিতে আরো ছোট্ট দুটো ভালবাসার গল্প আছে।
তারই একটা হচ্ছে ইন্দিরা পিসি প্রতি অপু দুর্গার ভালবাসা। পরাশ্রিত বিধবা অসহায় এই পিসিকে তারা বড্ড ভালবাসে। পিসির কাছেও এরা দুজন জোড়ামানিক। দিন শেষে রাতে এই পিসির কোলে মাথা রেখেই তারা বিচরণ করে রুপকথার দেশে, রাজপুত্র ডালিমকুমারের সাথে মিলে যুদ্ধ করে রাক্ষোস খোক্ষসের সাথে। দুর্গাও যেন এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেই নানা ফল ফলাদি সংগ্রহ করে পিসিকে এনে দেয়।

আরেকটা অনু-গল্প আছে ইন্দিরা- সর্বজয়ার মাঝে। এরা দুজনই আপাতদৃষ্টে একে অপরের উপর নাখোশ। পিসি দুর্গাকে নানাভাবে চুরি করতে লাই দেয়, রান্নাঘর থেকে নানা জিনিস সরাতেও পিসির হাত পাকা। এজন্য সুযোগ পেলেই তাকে দু কথা শুনিয়ে দেয় সর্বজয়া। ফলে মাঝে মাঝেই বাড়ি ছেড়ে আরেক দূর আত্মীয়ের বাসায় চলে যান পিসি কিন্তু কিছুদিন পরেই আবার মায়ার টানে ফিরে আসেন তিনি। সর্বজয়াও মুখে ভালবাসার অভিব্যাক্তি না ফোটালেও অন্তরে পিসির জন্যে তার মন বেশ দুর্বল, সেটা ভালভাবে বুঝতে সিনেমাটি দেখা আবশ্যক

এই তিনটি ভালবাসার গল্পই যেন সবার জন্য প্রযোজ্য, জীবনের পথে চলতে গিয়ে আমরা এমন অনেক ভালবাসার মুখোমুখি হই যার কোনোটাতে শুধু একপক্ষ ভালবাসার নিদর্শন দিয়েই যায় আর বিপরীতে অন্যপক্ষ দেখায় চরম আনুগত্য।
আবার হয়ত, দুপক্ষই একে অন্যকে ভালবাসে লেনা-দেনার ভিত্তিতে, তবে সে লেনাদেনা টাকার নয়, অদৃশ্য এক বস্তুর,যা মিটে গেলেই জানান দেয় কি ছিল সে।
কখনো আবার ভালবাসাটাই হয়ে যায় উহ্য, দুজন্যের মধ্যে তিক্ততার সম্পর্কের মধ্যেও যা দুজনকেই বেধে রাখে অদৃশ্য এক সুতোয়। যে সুতো ছিড়ে গেলেই বুঝতে পারি তার অস্তিত্ব।

এছাড়াও সত্যজিত সযত্নে অঙ্কিত করেছেন, প্রতিবেশি ও পন্ডিতমশায়ের চরিত্র। এরা সবাই যেন একই পথের সারথী, শুধু রথটাই আলাদা।

অভিনয় শিল্পী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই জহুরী। জহুরীর চোখে যেমন আসল হীরার ঝলক এড়ায় না, ঠিক তেমনি প্রায় সারা জীবনেই তিনি নানা নতুন অভিনয় শিল্পী খুজে বের করেছেন। সে তুলনায় তিনি প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাদের সাথে কমই কাজ করেছেন।
পথের পাচালীর জন্যেও তিনি ভরসা রেখেছেন এক ঝাক নতুন মুখের উপর, এবং তারা তার মানও রেখেছেন।
ছোট্ট শিশু দূর্গার চরিত্রে অভিনয় করা রুমকী থেকে বয়োবৃদ্ধা ইন্দিরার চরিত্রে অভিনয় করা চুনিবালা দেবী, সবাই তাদের সেরা কাজটাই উপহার দিয়েছেন আমাদের। প্রতিটা চরিত্রই তার প্রেক্ষাপটের সাথে একদম মিশে গেছেন, একবারো মনে হয়নি যে তারা অভিনয় করছেন।

তবে সত্যজিত রায়ের সিনেমার সবচেয়ে যে দিকটা বেশি আকর্ষনীয় তা হল সিনেমাটোগ্রাফী। তার সিনেমা দেখা মানেই চোখের জন্য অসম্ভব আরামদায়ক সময় কাটানো।
অর্থের জোগানের অভাবে তেমন মানের ক্যামেরা তিনি সংগ্রহ করতে পারেন নি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহায়তায় করা মুভিটা তহবিল জটিলতায় দু বার শুটিং বন্ধ রাখার মত পরিস্থিতিতেও পড়ে ।
কিন্তু এসব কিছুই বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনি সত্যজিতের সামনে, তার অসাধারন চিত্রগ্রহন পরিচালনা একবারও বুঝতে দেয়নি ক্যামেরার কমতি।
বাশঝাড়ের মধ্যেই হোক আর ধু ধু প্রান্তরের কাশফুল বাগানের মধ্যেই হোক, সবখানেই তার নিখুত হাতের অপূর্ব মুন্সিয়ানা তিনি দেখিয়েছেন।

জীবন যাত্রার সময় বয়ে যাওয়া বোঝাতে ডুবোজলে কলমি শাক, বা জীবন যুদ্ধের সংগ্রাম বোঝাতে ভেসে চলা পানি পোকার দৃশ্যায়ন বুঝি সত্যজিতের পক্ষেই সম্ভব। সংলাপ ছাড়াই অল্প কয়েক ফ্রেমেই কত কিছু বুঝিয়ে দেওয়া যায় তা এখনকার পরিচালকরা যত দ্রুত শিখবেন ততই বাংলা সিনেমার জন্য মঙ্গলকর।

বাংলা সিনেমার এই অমর রত্ন আমরা প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলাম ২০ জুলাই, ১৯৯৩ সালে। অপু ট্রিলজির মুভি প্রিন্ট সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় লন্ডনের এক ল্যাবে আগুন ধরে যায়, ফলে অর্ধেকেরও বেশি প্রিন্ট সম্পুর্ণ রুপে পুড়ে অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ে।
সেই নষ্টপ্রায় প্রিন্ট ২০ বছর পর Criterion Collection এর উদ্যোগে ২০১৩ সালে ঠিক করার কাজ শুরু করা হয়।
অবশেষে তিনটি মুভিই 4K রেজুলেশনে ব্লু-রে তে প্রকাশ করে Criterion Collection
তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন মহান এক কাজের জন্যে।

আমার দেখা সেরা বাংলা মুভির নাম আসলে বিনাদ্বীধায় আমি পথের পাঁচালীর কথা বলব।
দেখা না থাকলে আপনিও দেখে ফেলুন বাংলা সিনেমার এমন মহামূল্যবান শিল্পকর্ম।

আমার রেটিং :

Leave a Reply